রজব মাসের ফযিলত,মর্যাদা ,রোজা ও আমল - Virtues of the month of Rajab

রজব মাসের ফযিলত,মর্যাদা ,রোজা ও আমল - Virtues of the month of Rajab

 

রজব মাসের ফযিলত,মর্যাদা ,রোজা ও আমল 

এই মাসটির পুরো নাম ‘রজবুল মুরাজ্জাব’ বা ‘আর-রজব আল-মুরাজ্জাব’ হলেও এটি রজব মাস নামেই বেশি পরিচিত। মাসটির অর্থগত তাৎপর্যও রয়েছে। ‘রজব’ শব্দের অর্থ হলো সম্ভ্রান্ত, মহান বা প্রাচুর্যময়। আর ‘মুরাজ্জাব’ অর্থ ‘সম্মানিত’। সুতরাং এর অর্থ দাঁড়ায় ‘প্রাচুর্যময় সম্মানিত মাস’।

মর্যাদার এ মাসটিকে মহান আল্লাহ তাআলা যাবতীয় যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

‘আল্লাহ তাআলার আসমান-জমিন সৃষ্টি করার দিন থেকেই বারো মাসে বৎসর হয়। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত; তিনটি একাধারে জিলকদ, জিলহজ ও মহররম এবং চতুর্থটি হলো ‘রজব মুদার’, যা জমাদিউল আখিরা ও শাবানের মধ্যবর্তী মাস।’ (মুসলিম)

মর্যাদার এ মাসটি মুমিন মুসলমানের ইবাদতের মাস। বরকত লাভের মাস। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোমড়ে কাপড় বেঁধে এ মাসের ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত হতেন। রোজা রাখতেন এবং বেশি বেশি বরকত পেতে দোয়া পড়তেন; তাঁর উম্মতকেও দোয়া পড়তে বলতেন। তাহলো এমন-

اَللهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِىْ رَجَبَ وَ شَعْبَانَ وَ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন; রমজান মাস আমাদের নসিব করুন।’ (বুখারি ও মুসলিম)


সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টিতে রজব মাস

মাস জুড়ে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত-দোহা, জাওয়াল, আউয়াবিন; তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলুল মাসজিদ ইত্যাদি নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া খুবই জরুরি। সাহাবায়ে কেরামও এ মাসের ইবাদত ও ফজিলত বর্ণনা করেছেন।

- হজরত সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, রজব মাসের প্রথম তারিখে ১০ রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়।

- হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, অতি মহান (মর্যাদার) ৪টি রাত হলো-

- রজব মাসের প্রথম রাত;

- শাবান মাসের মধ্য দিবসের রাত (শবে বরাত);

- শাওয়াল মাসের প্রথম রাত (ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদের রাত);

- জিলহজ মাসের দশম রাত (ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদের রাত)।


সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, রজব মাসের মর্যাদা, ফজিলত ও আমলের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা। হাদিসের ওপর যথাযথ আমল করা। রমজানের পরিপূর্ণ ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে রজবের মাসের ফজিলত, মর্যাদা ও আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ করার তাওফিক দান করুন। মাসজুড়ে হাদিসে বর্ণিত দোয়াটি বেশি বেশি পড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

৬০ মাসের রোযার সাওয়াব

হাদীসে পাকে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি ২৭ রজবের রোযা রাখবে, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য ষাট (৬০) মাসের রোজার সাওয়াব লিখে দিবেন। আর তা সেই দিন, যেই দিনে হযরত জিবরাঈল عليه السلام হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর জন্য প্রথম অহী নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। (তানযিহুশ শরীয়াহ, খন্ড-২য়, পৃ-১৬১, হাদীস নং-৪১)


শত বছরের রোজার সাওয়াব

হযরত সায়্যিদুনা সালমান ফারসী رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, আল্লাহর মাহবুব হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর বাণী হচ্ছে, রজবে এমন একটি দিন ও রাত রয়েছে যে, সেই দিনে যে রোযা রাখবে ও রাতে কিয়াম তথা ইবাদত বন্দেগী করবে সে যেন একশত বছর রোযা রাখল। আর সেই দিন হল ২৭ রজব। এই দিন হযরত মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ তাআলার প্রতি প্রেরণ করেছেন। (শুআবুল ঈমান, খণ্ড-৩য়, পৃ-৩৭৪, হাদীস নং-৩৮১১)


রজবুল মুরাজ্জবের রোযা

প্রিয় ইসলামী ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলার নিকট চারটি মাস বিশেষভাবে সম্মানিত। সুতরাং আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- (কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ)

নিশ্চয় মাসগুলোর সংখ্যা আল্লাহর নিকট বার মাস, আল্লাহর কিতাবের মধ্যে, যখন থেকে তিনি আসমান ও জমীন সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে চারটা সম্মানিত। এটাই সহজ সরল দ্বীন। তাই এ মাসগুলোর মধ্যে নিজেদের আত্মাগুলোর উপর যুলুম করো না এবং মুশরিকদের বিরুদ্ধে সর্বদা যুদ্ধ করো, যেমনিভাবে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বদা যুদ্ধ করে এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ খোদাভীরুদের সাথে রয়েছেন। (পারা-১০, সূরা-তওবা, আয়াত-৩৬)

উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত সায়্যিদুনা সদরুল আফাযিল মওলানা নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী رحمة الله عليه  খাযাইনুল ইরফানে বর্ণনা করেন, (চার পবিত্র মাস দ্বারা উদ্দেশ্য) তিনটি লাগাতার জিলক্বদ, জিলহজ্জ, মুহাররাম, আর একটি পৃথক রজব। আরবের লোকেরা জাহেলী যুগেও এই মাস গুলোতে যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম হিসেবে জানত। ইসলামেও এই মাসগুলোর শান মান ও গুরুত্ব বৃদ্ধি করা হয়েছে। (খাযাইনুল ইরফান, পৃ. ৩০৯)


ঈমান আলোকিতকারী ঘটনা

হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রুহুল্লাহ عليه السلام এর সময়ের ঘটনা, এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন থেকে কোন এক মহিলার প্রেমে আসক্ত ছিল। একদা তিনি তার প্রেমিকাকে নাগালে পেয়ে গেলেন। তখন মানুষের কথাবার্তা থেকে তিনি অনুমান করতে পারলেন যে, মানুষেরা চাঁদ দেখছে। তখন ঐ ব্যক্তি সে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করল, মানুষেরা কোন মাসের চাঁদ দেখছে? ঐ মহিলা উত্তর দিল “রজবের চাঁদ।”

ঐ ব্যক্তি কাফির হওয়া সত্ত্বেও যখনই রজব মাসের নাম শুনল সাথে সাথে (রজবের) সম্মানার্থে ঐ মহিলা থেকে পৃথক হয়ে গেলেন ও যিনা থেকে বিরত রইলেন।

হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রুহুল্লাহ عليه السلام এর প্রতি নির্দেশ আসল যে আমার অমুক বান্দার সাক্ষাৎ করতে যান। তখন তিনি তার কাছে তাশরীফ নিয়ে গেলেন এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশ ও নিজের আগমনের কথা বর্ণনা করলেন। এই কথা শুনতেই তার অন্তর ইসলামের নূরে আলোকিত হয়ে গেল এবং দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করল। (আনিসুল ওয়ায়েজীন, পৃ-১৭৭)

কুরআনে পাকেও হারাম মাস সমূহে স্বীয় আত্মার উপর অত্যাচার করতে নিষেধ করেছেন। যেমন-

কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ -

(তোমরা) এ মাসগুলোর মধ্যে নিজেদের আত্মাগুলোর উপর জুলুম করো না।”

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় রয়েছে-“অর্থাৎ বিশেষ করে ঐ চার মাস সমূহে গুনাহ করবে না যেহেতু এতে গুনাহ করা মানে নিজের উপর জুলুম করা অথবা পরস্পরে একে অপরের উপর জুলুম করো না। (নুরুল ইরফান, পৃ-৩০৬)


দুই বছরের (ইবাদতের) সাওয়াব

হযরত সায়্যিদুনা আনাস رضى الله عنه থেকে বর্ণিত আছে যে, নবীদের সরদার, শাহান শাহে আবরার, হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর সুগন্ধময় বাণী হচ্ছে, “যে ব্যক্তি হারাম মাসে তিন দিন বৃহস্পতিবার শুক্রবার এবং শনিবার সাপ্তাহিক রোযা রাখবে, তার জন্য ২ বছরের ইবাদতের সাওয়াব লিখে দেওয়া হবে। (মাযমাউয যাওয়ায়েদ, খন্ড-৩য়, পৃ-৪৩৮, হাদীস নং-৫১৫১)


রজবের বাহার সমূহ

হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত সায়্যিদুনা ইমাম মুহাম্মদ গায্যালী رحمة الله عليه ‘মুকাশিফাতুল কুলুব’ কিতাবে লিখেছেন, রজব(رَجَب) শব্দটি মূলত তারজীব (تَرجِيب) থেকে উৎপত্তি তার অর্থ “সম্মান” করা। উহাকে আল আছীব (الاصيب) সবচেয়ে গতিময় বন্যা বলা হয়। এই জন্য যে এই মুবারক মাসে তওবাকারীদের উপর রহমতের বন্যা বয়ে যায়। আর ইবাদতকারীদের উপর কবুলিয়তের ফয়েয বর্ষণ হয়।

আবার এই মাসকে আল আছম (الاصم) তথা বধিরও বলা হয় কেননা এই মাসে যুদ্ধ বিগ্রহের আওয়াজ মোটেই শুনা যায় না। আবার একে রজবও বলা হয়, যেহেতু জান্নাতের একটি নদীর নাম রজব রয়েছে যার পানি দুধের চেয়েও সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং বরফের চাইতে ঠান্ডা। এই নদী থেকে সে-ই পান করতে পারবে যে রজব মাসে রোজা রাখবে। (মুকাশাফাতুল কুলুব, পৃ-৩০১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

গুনিয়াতুত তালেবীন এ উলে−খ আছে যে, এই মাসকে শাহরো রজম (شَهرُ رَجَم) তথা পাথরের মাসও বলা হয়। কেননা এ মাসে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। যাতে শয়তান মুসলমানদেরকে কষ্ট দিতে না পারে। এই মাসকে আসম (اَصَم) তথা বধিরও বলা হয় কেননা এ মাসে কোন জাতীর উপর আল্লাহ তা’আলার শাস্তি অবতীর্ণ হতে শুনা যায়নি। আল্লাহ তা’আলা আগের উম্মতগণকে এ মাস ছাড়া অন্য সব মাসে শাস্তি দিয়েছেন। (গুনিয়াতুত তালেবীন, পৃ-২২৯)


বীজ বপনের মাস

হযরত সায়্যিদুনা আল্লামা ছাফওরী رحمة الله عليه ইরশাদ করেন, রজব মাস বীজ বপনের, শাবান পানি দ্বারা সেচ দেয়ার ও রমযান ফসল কাটার মাস।

এজন্য যে ব্যক্তি রজব মাসে ইবাদতের বীজ বপন করবে না, আর শাবান মাসে চোখের পানি দ্বারা সেচ দেবেনা, সে রমযান মাসে রহমতের ফসল কিভাবে কাটবে? তিনি আরো বলেন, রজব মাস শরীরকে, শাবান মাস হৃদয়কে এবং রমযান মাস আত্মাকে পবিত্র করে দেয়। (নুযহাতুল মাযালিস, খন্ড-১ম, পৃ-১৫৫)


পাঁচটি বরকতময় রাত

হযরত সায়্যিদুনা আবু উমামা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত যে, নবীয়ে করিম, রাউফুর রহীম হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর মহান বাণী হচ্ছে, পাঁচটি এমন রাত রয়েছে যেগুলোতে দু’আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না।

(১) রজবের প্রথম রাত,

(২)শাবানের ১৫ তারিখের রাত

(৩) বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যবর্তী রাত

(৪) ঈদুল ফিতরের রাত,

(৫) ঈদুল আযহার রাত।

(আল জামেউস সগীর, পৃ-২৪১, হাদীস নং-৩৯৫২)

হযরত সায়্যিদুনা খালিদ বিন মি’দান رضى الله عنه বর্ণনা করেন, বছরে ৫টি রাত এমন রয়েছে যে, যে ব্যক্তি এগুলোকে বিশ্বাস করে, সাওয়াবের নিয়্যতে ঐ রাতগুলোকে ইবাদত বন্দেগীতে অতিবাহিত করে তবে আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

(১) রজবের ১ম রাত। এই রাতে ইবাদত করবে ও দিনে রোজা রাখবে।

(২), (৩) দুই ঈদের (তথা ঈদুল ফিতর ও আযহার) রাত। (এই দুই রাতে ইবাদত বন্দেগী করবে কিন্তু দিনে রোজা রাখবে না। দুই ঈদের দিন রোযা রাখা জায়েয নেই।)

(৪) ১৫ই শাবানের রাত। এই রাতে ইবাদত করবে ও দিনে রোজা রাখবে।

(৫) আশুরার রাত (তথা মুহাররামূল হারামের ১০ তারিখ রাত)। ঐ রাতে ইবাদত করবে ও দিনে রোযা রাখবে। (গুনিয়াতুত তালেবীন, পৃ-২৩৬, দারু ইহইয়াউত তুরাসিল, আরবী বৈরুত)


২৭ তারিখের রোজা ১০ বছরের গুনাহের কাফ্ফারা

আলা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত, ইমাম আহমদ রযা খান رحمة الله عليه ইরশাদ করেন যে, “ফাওয়ায়িদে হানাদে” হযরত সায়্যিদুনা আনাস رضى الله عنه  হতে বর্ণিত আছে, নবীয়ে করিম, রঊফুর রহীম হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেছেন, “২৭ রজবে আমার নবুওয়্যত প্রকাশ হয়েছে। যে ব্যক্তি এই দিন রোজা রাখবে আর ইফতারের সময় দু‘আ করবে, (তাহলে তা) ১০ বছরের গুনাহের কাফ্ফারা হবে।”

(ফাতাওয়ায়ে রযবীয়্যাহ্, খন্ড-১০ম, পৃ-৬৪৮)

একটি জান্নাতী নহরের নাম রজব

হযরত সায়্যিদুনা আনাস رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তাআলার রসূল হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেন, “জান্নাতে একটা নদী রয়েছে, যাকে ‘রজব’ বলে, যা দুধের চেয়েও সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি। তাই যে ব্যক্তি রজব মাসের একটি রোযা রাখবে, আল্লাহ তাকে ওই নদী থেকে পান করিয়ে তৃপ্ত করবেন।” (শুয়াবুল ঈমান, খন্ড-৩য়, পৃষ্ঠা-৩৬৭, হাদীস নং-৩৮০০)


নুরানী পাহাড়

একদা হযরত ঈসা عليه السلام আলোক ঝলমল এক পাহাড় দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার দরবারে আরয করলেন, “হে আল্লাহ! এই পাহাড়কে কথা বলার শক্তি দান করুন।” তখন ঐ পাহাড় কথা বলতে লাগল। “ইয়া রুহুল্লাহ! আপনি কি চান?” ঈসা عليه السلام বললেন, তোমার অবস্থা বর্ণনা কর।” পাহাড় বলল “আমার ভিতর একজন মানুষ আছে।” তখন হযরত সায়্যিদুনা ঈসা রুহুল্লাহ عليه السلام আল্লাহর দরবারে আরয করলেন, হে আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে আমার নিকট প্রকাশ করে দিন। (এই কথা বলার সাথে সাথে) সেই পাহাড় এমনিতে ফেটে গেল এবং এর ভিতর থেকে চাঁদের মত উজ্জল চেহারা বিশিষ্ট একজন মানুষ দেখা গেল। তিনি আরয করলেন, “আমি হযরত সায়্যিদুনা মুসা কলিমূল্লাহ عليه السلام এর উম্মত। আমি আল্লাহর কাছে এই দু’আ করেছিলাম যেন তিনি আমাকে তাঁর প্রিয় মাহবুব হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর আগমনের সময় পর্যন্ত জীবিত রাখেন যাতে আমি তার যিয়ারত করতে পারি এবং তাঁর উম্মত হওয়ার সম্মানও অর্জন করতে পারি।

الحمد لله عزوجل

 এই পাহাড়ে আমি ছয়শত (৬০০) বছর ধরে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে মশগুল রয়েছি। হযরত ঈসা عليه السلام আল্লাহ তাআলার দরবারে আরয করলেন, “হে আল্লাহ যমিনের উপরে এই বান্দার চেয়েও তোমার দরবারে অধিক সম্মানিত কোন বান্দা আছে কি? (আল্লাহর পক্ষ থেকে) ইরশাদ হল, “হে ঈসা عليه السلام! উম্মতে মুহাম্মদী ﷺ এর মধ্যে যারা রজব মাসে একটি রোজা রাখবে সে আমার নিকট এর চাইতেও সম্মানিত।”

(ইমাম ছাফুরী (রহঃ) : নুযহাতুল মাজালিশ, খন্ড-১ম, পৃ-১৫৫)


একটি রোযার ফযীলত

সর্বজন গ্রহণযোগ্য আলিমে দ্বীন, হযরত শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী رحمة الله عليه বর্ণনা করেন যে, সুলতানে মদীনা হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর বাণী হচ্ছে,

“রজব মাস হারাম তথা পবিত্র মাস সমূহের অন্তর্ভুক্ত। আর ৬ষ্ঠ আসমানের দরজায় এই মাসের দিনগুলি লিখা রয়েছে। যদি কোন ব্যক্তি এই মাসের একটি রোজা রাখে আর তা তাকওয়াপরহিযগারীর মাধ্যমে পূর্ণ করে, তখন সেই দরজা ও রোযা ঐ বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে এবং আরজ করবে, “হে আল্লাহ! এই বান্দাকে ক্ষমা করে দাও।” আর সেই বান্দা যদি তাকওয়া পরহিযগারীতা ছাড়া রোজা অতিবাহিত করে তাহলে সেই দরজা ও দিন তার গুনাহ্ ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট আবেদন করে না। আর রোযাদারকে বলবে, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার নফস তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে। (মাসাবাতা বিসসুন্নাহ, পৃ-৩৪২)


হযরত নূহ عليه السلام এর কিশতিতে রজবের রোযার বাহার

হযরত সায়্যিদুনা আনাস رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, রসূল ﷺ  ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি রজব মাসের একটি রোযা রাখল তবে তার জন্য জাহান্নামের সাতটি দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি আটটি রোজা রাখবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি ১০টি রোজা রাখবে সে আল্লাহর কাছে যাই চাইবে তা আল্লাহ তাকে দান করবেন। যে ব্যক্তি পনেরটি রোজা রাখবে, তখন আসমান থেকে এক আহ্বানকারী আহ্বান করে বলবে যে, তোমার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে। তুমি আজ থেকে নতুন করে আমল শুরু কর। তোমার গুনাহ সমূহ নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। আর যারা এর চেয়ে বেশি করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে বেশি পরিমাণে দান করবেন। আর রজব মাসেই হযরত নুহ عليه السلام কিশতিতে আরোহন করেছিলেন, তখন তিনি নিজেও রোজা রেখেছেন, সাথে সাথে সাথীদেরকেও রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার কিশতি ১০ই মহরম পর্যন্ত ছয় মাস সফর অবস্থায় ছিল।

(শুআবুল ঈমান, খণ্ড-৩য়, পৃ-৩৬৮, হাদীস নং-৩৮০১)


জান্নাতী মহল

হযরত সায়্যিদুনা আবু কিলাবা رضى الله عنه ইরশাদ করেন, “রজব মাসের রোযাদারদের জন্য জান্নাতে একটি মহল রয়েছে।”

(শুআবুল ঈমান, খন্ড-৩য়, পৃ-৩৬৮, হাদীস নং-৩৮০২)


পেরেশানী দূর করার ফযীলত

হযরত সায়্যিদুনা ইবনে যুবাইর رضى الله عنه ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি রজব মাসে কোন মুসলমানের চিন্তা দূর করবে, তবে আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতে এমন একটি মহল দান করবেন যার প্রশস্ত হবে দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত। তোমরা রজব মাসের সম্মান কর, আল্লাহ তোমাদেরকে হাজার কারামতের সাথে সম্মানিত করবেন। (গুনিয়াতুত তালেবীন, পৃ-২৩৪)


একশত (১০০) বছরের রোযার সাওয়াব

২৭ শে রজবের গুরুত্বের কথা কি বলব! ঐ তারিখে আমাদের প্রিয় আকা হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর উপর ১ম বার ওহী নাযিল হয়েছে এবং এই তারিখেই মেরাজের সেই আজিমুশশান মুজিজা প্রকাশ পেয়েছিল। ২৭ রজব শরীফের রোযার অনেক ফযীলত রয়েছে। যেমন-

হযরত সায়্যিদুনা সালমান ফারসী رضى الله عنه হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেন, “রজবে একটি দিন ও রাত এমন রয়েছে, যে ব্যক্তি সে দিনে রোযা রাখবে ও রাতে নফল ইবাদতে অতিবাহিত করবে, তা ১০০ বছরের রোযার সমান। আর তা হল ২৭ রজব। ঐ তারিখেই আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর নিকট ওহী প্রেরণ করেছেন।”

(শুআবুল ঈমান, খন্ড-৩য়, পৃ-৩৭০, হাদীস নং-৩৮১১)


একটি নেকী শত বছরের নেকীর সমান

রজব মাসে এমন একটি রাত রয়েছে ঐ রাতে নেক আমলকারীদেরকে একশত বছরের নেকীর সাওয়াব দান করা হয়। আর তা রজবের ২৭ তারিখের রাত। যে ব্যক্তি ঐ রাতে ১২ রাকাআত নামায এইভাবে আদায় করবে যে, প্রতি রাকাআতে সুরায়ে ফাতিহা ও অন্য যে কোন একটি সুরা পাঠ করবে আর প্রতি দুরাকাআত পর পর আত্তাহিয়্যাতু পড়বে এভাবে ১২ রাকাআত পূর্ণ হলে সালাম ফিরাবে এরপর ১০০ বার বর্ণিত দু‘আ পড়বে سُبحَانَ اللهِ وَالحَمدُ لِلهِ وَلَااِلهَ اِلَّ اللهُ وَاللهُ اَكبَر, ১০০ বার ইস্তিগফার, ১০০ বার দুরূদ শরীফ আর নিজ দুনিয়া ও আখিরাতের যা ইচ্ছা তা চেয়ে দু’আ করবে, আর সকালে রোযা রাখবে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তার সমস্ত বৈধ দু’আ কবুল করবেন। (শুআবুল ঈমান, খণ্ড-৩য়, পৃ-৩৭৪, হাদীস নং-৩৮১২)

সুত্র - সুন্নী-এনসাইক্লোপিডিয়া


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Be alert before spamming comments.

নবীনতর পূর্বতন

Sponsored

Responsive Ad