ইমাম আ’যম আবু হানিফা (র)'র সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত

ইমাম আ’যম আবু হানিফা (র)'র সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত

🟡নাম ও পরিচয় :


নাম - নােমান, উপনাম - আবু হানিফা, পিতার নাম- সাবিত, উপাধি: ইমাম আ'যম, ইমামুল আইম্মাহ, সিরাজুল উম্মাহ, রঈসুল ফুকাহা, ওয়াল মুজতাহিদীন, সায়্যেদুল আউলিয়া ওয়াল মুহাদ্দিসীন, হাফেযুল হাদীস। পূর্ণ নাম- নােমান ইবনে সাবিত ইবনে নাে'মান ইবনে মারযুবান। 


🟡শুভজন্ম :


ইমাম আবু হানিফা (র)’র পৌত্র ইসমাঈল (রহ) বলেছেন-তিনি ৮০ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তবে অধিকাংশ ওলামায়ে কিরামের মতে, তাঁর জন্মসাল ৮৪ হিজরী সন।


🟡আবু হানীফা উপনামের কারণ :


ইমাম আবু হানিফা (র)'র উপনাম আবু হানিফা হওয়ার কারণ বর্ণনায় ইবনে হাজর মক্কী (র) বলেন, তাঁর উপনাম আবু হানিফা এ ব্যাপারেও সবাই একমত। হানিফা শব্দটি ‘হানিফুন এর স্ত্রীলিঙ্গ। যার অর্থ হলাে নাসেক, আবেদ ও মুসলিম। কেননা হানিফ শব্দের অর্থ হলাে ধাবিত হওয়া। মুসলিমরা দ্বীনে হকের দিকে ধাবিত হয়।তাই তার উপনাম আবু হানিফা । 


✨কেউ কেউ বলেছেন তার উপনাম আবু হানিফা হওয়ার কারণ হলাে-তাঁর নিকট সর্বদা দোয়াত থাকত। ইরাকী ভাষায় এটাকে হানিফা বলা হয়।


✨আল্লামা ইবন হাজার হায়তামী (র) বলেছেন, আভিধানিক অর্থে নুমান বলা হয় সেই রক্তকে যার উপর একটি দেহের সমগ্র কাঠামো নির্ভর করে। যার মাধ্যমে একটি দেহের পুরা মেশিন সক্রিয় থাকে। ইমাম আযম (র)-এর সত্তাও ইসলামের ব্যবস্থাপনার জন্য অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু এবং সকল প্রকার ইবাদাত ও লেনদেনসহ সকল বিধিবিধানের জন্য প্রাণস্বরূপ।


✨তিনি আরো বলেন, নুমান শব্দের অর্থ সুগন্ধিযুক্ত লাল ঘাস এবং যা থেকে চতুর্দিকে সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে।ইমাম আবু হানীফা (র)-এর ফিকহশাস্রে গবেষণা এবং অধ্যবসায়ও পৃথিবীর চতুর্দিকে একটি সুবাতাস ছড়িয়ে দিয়েছে।


🟡হাদিস শরিফে ইমাম আবু হানিফা (রহ) এর ভবিষ্যতবাণী :


হযরত আবু হােরায়রা (রা) বলেন, আমরা রাসূল (ﷺ)'র খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। এই মজলিসে সূরা জুমা অবতীর্ণ হয়েছে। যখন রাসূল এ সূরার আয়াত واٰخرين منهم لما يلحقوابهم তিলাওয়াত করেন তখন উপস্থিত লােকদের মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! লােকগণ কারা যারা এখনাে আমাদের সাথে মিলিত হয়নি? তিনি এ প্রশ্ন শ্রবণ করে চুপ রইলেন। যখন বার বার প্রশ্ন করা হলাে তখন তিনি হযরত সালমান ফার্সীর কাঁধে হাত মােবারক রেখে বললেন-


لو كان الايمان عند الثريا لناله رجل من هؤلاء


“ঈমান যদি তারকারাজিতেও থাকে তবুও এর সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি সেখান থেকে তা অন্বেষন করে নেবে"


✨ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ূতী (র) বলেন এই হাদিসের বিশুদ্ধতার উপর সবাই একমত এবং এতে ইমাম আবু হানিফা (র)'র দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। 


🔸ইবনে হাজার মক্কী (র) আরাে বলেন, ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে ভবিষ্যত বাণীর বিষয়টি এ হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত হয় -


ترفع زينة الدنيا سنة خمسين ومائة


"১৫০ হিজরীতে দুনিয়ার সৌন্দর্য উঠে যাবে।” প্রখ্যাত ফিকাহ বিশেষজ্ঞ শামশুল আইম্মা আব্দুল গাফফার কুদরী (র) বলেন : এ হাদিস দ্বারা আবু হানিফা (র)ই উদ্দেশ্য। কারণ তিনি ঐ বছরই তথা ১৫০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন।


🔸ইয়াহ্ইয়া ইব্‌ন মা'আয বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি আপনাকে কোথায় তালাশ করব? তিনি ইরশাদ করলেন, আবু হানীফার ইলম-এর নিকট।


🔸হযরত দাতা গঞ্জে বখশ (র.) বলেন, আমি এক রাতে হযরত বিলাল (রা.)-এর মাযারের পাশে নিদ্রিত ছিলাম।আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি মক্কায় অবস্থান করছি। আরাে দেখলাম, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বৃদ্ধকে ছােট বালকের ন্যায় কোলে নিয়ে বনী শায়বার দরজা দিয়ে কাবাগৃহে প্রবেশ করছেন। আমি দৌড়ে গিয়ে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদ চুম্বন করলাম এবং বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে রইলাম যে, এই বৃদ্ধ কে ? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মনােভাব বুঝতে পেরে বললেন, ইনি হলেন তােমাদের আবু হানীফা । আমি বুঝতে পারলাম, ইমাম আবূ হানীফা (র.) রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের অনুসারী। কোন অবস্থায় তিনি সুন্নত পরিত্যাগ করেন না।


🟡জ্ঞানার্জন :


ইমাম আবু হানিফা (র) প্রাথমিক ও প্রয়ােজনীয় দ্বীনি ইলম শিক্ষার্জন করার পর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি মনােনিবেশ করলেন৷ একদিন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়ার সময় ইমাম শাবি রহ এর সাথে ইমাম আযমের দেখা হয়। তিনি ইমাম আযমকে বলেন, "তুমি ওলামাদের মজলিসে বস, কেননা আমি তোমার চেহারায় জ্ঞান ও ফযীলতের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি।"


✨ইমাম শা'বী (র)'র সাথে সাক্ষাতের পর ইমাম আ'যম (র) 'র অন্তরে ইলমে দ্বীনের সর্বোচ্চ জ্ঞানার্জনের আগ্রহ সৃষ্টি হলাে। তিনি প্রথমত ইলমে কালাম শিক্ষা আরম্ভ করেন। অতঃপর তিনি ইলমে হাদিস ও ইলমে ফিকহের প্রতি মনােনিবেশ করেন।


🟡ইলমে ফিক্বহে মনোনিবেশ :


একরাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন যে, তিনি রাসূল (ﷺ)'র কবর শরীফ খনন করতেছেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী সবচেয়ে বড় আলিম ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সীরীন (র)'র নিকট এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাইলে তিনি বলেন, আপনি রাসূল এর হাদিস ও সুনান থেকে মাসয়ালা বের করবেন এবং এমন কঠিন বিষয়ের সমাধান করবেন যা ইতিপূর্বে কেউ করেননি। তিনি এই স্বপ্নকে অদৃশ্যের ইঙ্গিত মনে করে পূর্ণ মনযােগ সহকারে ইলমে ফিকহ অর্জনে ব্রত হলেন।


🔸একরাতে স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি নবী করীম (ﷺ)-এর পবিত্র রওযা হতে তাঁর পবিত্র হাড় সংগ্রহ করছেন এবং একটির চেয়ে অন্যটিকে বেশী পছন্দ করছেন। এ স্বপ্ন দেখে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি প্রখ্যাত স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারী মুহাম্মদ ইব্‌ন সীরীনের এক সাথীর নিকট তার স্বপ্নের কথা বললেন।


✨স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী বললেন, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নতের রক্ষণাবেক্ষণের এই স্তরে পৌছবেন যে, ভুল ও শুদ্ধকে পৃথক করে দেখাবেন। 


🔸অতঃপর অন্য এক রাতে স্বপ্নে দেখেন, নবী করীম (ﷺ) তাঁকে বলেন, হে আবু হানীফা! আমার সুন্নতকে পুনর্জীবিত করার জন্য আল্লাহ্ তােমাকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং নির্জনতার ইচ্ছা পরিহার কর।


🟡ইমাম হাম্মাদ (রঃ) এর শিষ্যত্ব গ্রহণ :


ইমাম আ'যম (র) হযরত হাম্মাদ (র)'র পাঠদান মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিয়মানুযায়ী নতুন ছাত্র হিসেবে তাঁকে প্রথমে বাম সারিতে বসাতেন। হাম্মাদ (র) যখন তার তীক্ষ্ণ মেধা অনুধাবন করলেন, তখন তাঁকে ডান সারিতে এবং সবার আগে সামনে বসার অনুমতি প্রদান করেন।


✨তিনি যখন ইমাম হাম্মাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার বয়স বিশ বছর অতিক্রম করেছিল। তিনি আঠার বছর পর্যন্ত খেদমতে থেকে ইলমে হাদিস ও ইলমে ফিকহ অর্জন করেন। তিনি ইমাম হাম্মাদ (র) এর সাহচর্য ও স্থলাভিষিক্ত হওয়া ইমাম হাম্মাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ সম্পর্কে বলেন-আমি দশ বছর পর্যন্ত তাঁর সাহচর্যে ছিলাম। 


✨তিনি উস্তাদ হাম্মাদের ইন্তেকাল ১২০ হিজরী পর্যন্ত তাঁর সাহচর্যে ছিলেন। এ সময় ইমাম আবু হানিফা (র)'র বয়স হয়েছিল চল্লিশ বছর। উস্তাদের ইন্তেকালের পর চল্লিশ বছর বয়সে তিনি উস্তাদের স্থলাভিষিক্ত হন এবং ইলমে হাদিস ও ইলমে ফিকহ পাঠদানে লিপ্ত হন। 


🟡জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে দেশভ্রমণ ও উস্তাদের সংখ্যা :


ইমাম আবু হানিফা (র) ইলমে হাদিস অর্জনের জন্য কূফা ছাড়াও মক্কা, মদীনা ও বসরা বহুবার গমন করেছিলেন। কূফায় এমন কোন মুহাদ্দিস বাকী ছিলেন না যার ছাত্র হয়ে ইমাম আবু হানিফা (র) হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেননি।


✨ইমাম আবু হানিফা (র) অনেকবার বসরা গমণ করে তাদের থেকে ইলমে হাদিস অর্জন করেন। ইমাম ইয়াহিয়া ইবনে শায়বান (র) বলেন, ইমাম আবু হানিফা (র) থেকে বর্ণিত, “আমি বিশ বারের অধিক বসরায় গমণ করেছি। এতে কখনাে এক বছর কখনাে এর চেয়ে কম আবার কখনাে এর চেয়ে বেশী সময় পর্যন্ত অবস্থান করেছি।” 


🔸তিনি জীবনে মােট ৫৫ বার হজ্জ পালন করেন তাছাড়া ১৩০ হিজরী থেকে ১৩৬ হিজরী পর্যন্ত তিনি মক্কা-মদীনায় অবস্থান করেন। তিনি প্রায় দশ বছর মক্কা-মদীনায় অবস্থান করেন।  এ দীর্ঘ সময়ে সেখানে অবস্থিত প্রখ্যাত মুহাদ্দিসীনে কিরাম সহ পবিত্র হজ্জ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বড় বড় মুহাদ্দিসীনে কিরাম থেকে ইলমে হাদিস অর্জন করেন। তিনি ইমাম বাকির (র)'র পুত্র হযরত জাফর সাদিক (র) থেকে ইলমে হাদিস অর্জন করেন। এভাবে তিনি চার হাজার উস্তাদ থেকে ইলমে হাদীস ও ইলমে ফিকহ অর্জন করেছেন যাদের মধ্যে কয়েকজন সাহাবী সহ অধিকাংশ ছিলেন প্রসিদ্ধ তাবেঈ।


🟡শিক্ষাদান :


ইমাম আবু হানিফা (র) উস্তাদ হাম্মাদের ইন্তেকালের পর উস্তাদের হালকায়ে দরসের স্থলাভিষিক্ত হন। অল্প দিনের মধ্যে তার দরস-তদরীসের সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞান পিপাসু ছাত্রগণ তাঁর দরসে অংশ গ্রহণ করতে থাকেন। তৎকালে অন্য কোন মুহাদ্দীস বা ফকীহর এত সংখ্যক ছাত্র ছিলনা। 


✨মক্কা মুয়াযযমা, মদীনা মুনাওয়ারা, দামেশক, বসরা, কুফা, ওয়াসিত, মুসিল, জাযীরা, রিককা, রামাল্লাহ, মিসর, ইয়েমেন, বাহরাইন, বাগদাদ ইত্যাদি এলাকার সহস্র শিক্ষার্থী ইমাম আযমের দরসে শরীক হন এবং কুরআন, হাদীস, ফিকহ সহ অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম আ'যমের ছাত্রদের মধ্যে বহুসংখ্যক কুরআন বিশেষজ্ঞ, ফকীহ, মুহাদ্দিস ও বিচারক ছিলেন।


✨ইবনে হাজার মক্কী (র) বলেন, ইমাম আবু হানিফা (র) একদল সাহাবায়ে কিরামকে দেখেছেন, যারা তাঁর জন্মের (৮০ হিজরীর) পর কূফায় জীবিত ছিলেন। সুতরাং তিনি তাবেঈদের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম আ'যম (র) ১৫০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন, এ সময় ২২ থেকে ২৭জন সাহাবী জীবিত ছিলেন। তন্মধ্যে ৪/৭/১০ জন সাহাবীর সাথে তাঁর সাক্ষাতের বর্ণনা বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। “দুররুল মােখতার ” গ্রন্থে ২০জন এবং “খােলাসায়ে ইকমাল” নামক গ্রন্থে ২৬ জন সাহাবীর সাথে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ আছে। তিনি নিজেই বলেছেন, “আমি কূফায় হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা)কে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে দেখেছি।"


🟡হাদিস শাস্ত্রে ইমাম আ'যম (র)'র অবস্থান :


হাদিস শাস্ত্রের সর্বোচ্চস্থান হলাে ‘হাকেম’। আর হাকেম বলা হয় ঐ মুহাদ্দিসকে যিনি রাসূল (ﷺ)-এর সব হাদিস জানেন। ইমাম আ'যম (র) হাদিসশাস্ত্রে হাকেম’ ছিলেন।


🔹মােল্লা আলী ক্বারী (র) বলেন- “ইমাম আবু হানিফা (র) স্বীয় গ্রন্থসমূহে সত্তর হাজারের অধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং চল্লিশ হাজার হাদিস থেকে নির্বাচিত করে তিনি কিতাবুল আসার লিপিবদ্ধ করেছেন।” 


🔹সদরুল আইম্মা ইমাম মুয়াফিক (র) বলেন, "ইমাম আবু হানিফা চল্লিশ হাজার হাদিস থেকে কিতাবুল আসার নির্বাচিত করেছেন।” 


🔹ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ (র)'র বর্ণনা মতে ইমাম আযম আবু হানিফা (র) যেসব হাদিস বেলা তকরার (বারংবার ছাড়া) বর্ণনা করেছেন, এর সংখ্যা চার হাজার। 


ইমাম আ'যম কেবল আহকাম বিষয়ক হাদিসগুলাে তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন, যা সুনান হিসেবে প্রসিদ্ধ। বাকী চারশত হাদিস সুন্নাহ বা আহকাম সম্পর্কীয় ছিলনা বিধায় তিনি তা বর্ণনা করেননি।


🟡হাদিস শাস্ত্রে অনন্য অবদান:


ইমাম আবু হানিফা (র)'র ‘কিতাবুল আসার’ ইলমে হাদিসে তাঁর উচ্চ মর্যাদার ক্ষেত্রে অনেক বড় প্রমাণ। এই কিতাবটি ফিকহী আবওয়াব তথা ফিকহের অধ্যায়ে সুসজ্জিত করে লিখিত প্রথম কিতাব। 


🔸ইমাম সুয়ূতী (র) ‘তাবঈদুস সহীফা’ গ্রন্থে বলেন- ইলমে হাদীসে ইমাম আবু হানিফার অবদান ও মর্যাদা কম নয়। তিনিই সর্বপ্রথম ফিকহী বাব অনুযায়ী হাদিসের কিতাব প্রণয়ন করেছেন। এই মর্যাদায় অন্য কেউ পৌছতে পারেননি। এই কিতাবটিকে ইমাম মালিক (র)'র মুয়াত্তার উৎস বলে ধরে নেওয়া যায়।


🟡তাঁর ইলমে হাদিস সম্পর্কে বিশ্ববিখ্যাত ওলামায়ে কিরামের অভিমত :


🔹শায়খুল ইসলাম ইয়াযিদ ইবনে হারূন (র) বলেন, “ইমাম আবু হানিফা অত্যন্ত মুত্তাকী, পরিচ্ছন্ন গুণের অধিকারী মহাসাধক, আবিদ, আলিম, সত্যবাদী ও সমসাময়িক কালের হাদিসের সর্বাপেক্ষা হাফেযে হাদিস ছিলেন।”


🔹ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান (র) বলেন, আল্লাহর শপথ! আবু হানিফা (র) বর্তমান মুসলিম উম্মাহের মধ্যে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা বেশী বিজ্ঞ।


🔹মুহাদ্দিস ইয়াহিয়া ইবনে মুঈন (র) বলেন, “তিনি অত্যন্ত নির্ভরযােগ্য, বিশ্বস্ত ভুল-ভ্রান্তিমুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। হাদিসের বিষয়ে কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন বলে আমি শুনিনি।


🔹ইমাম আবু ইউসুফ (র) বলেন-আমি ইমাম আবু হানিফা (র)'র চেয়ে হাদিসের অর্থ এবং ফিকহী রহস্য সম্পর্কে বেশী জ্ঞাত কাউকে দেখিনি। যে মাসয়ালায় চিন্তা গবেষণা করতেন তাতে ইমাম আ'যমের দৃষ্টিভঙ্গী পরকালের মুক্তির দিকেই বেশী থাকত। আমি তাঁর জন্য আমার পিতার পূর্বে দোয়া করি।


🔹হাফিয মুহাম্মদ ইবনে মাইমুন (র) বলেন- ইমাম আ'যম (র)'র সময়কালে তাঁর চেয়ে বড় কোন আলিম, পরহেযগার, কোন যাহিদ, কোন আরিফ, ও কোন ফকীহ ছিলনা। খােদার শপথ! আমার কাছে লক্ষ আশরাফীও এত মূল্যবান ছিলনা, যে পরিমান খুশী হই তাঁর থেকে হাদীস শুনে। 


🟡ইলমে ফিকহ ও অন্যান্য বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের অভিমত:


🔹ইমাম শাফেঈ (র) বলেন, “ইলমে ফিকহে প্রতিটি মানুষ ইমাম আবু হানিফা (র)'র পরিবারভুক্ত।"


🔹আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (র) বলেন- “ইমাম আবু হানিফা হলেন জ্ঞানের খাটি নির্যাস।"


🔹মিসআর ইবনে কিদাম বলছেন যে, কুফার জমীনে শুধু ২জন ব্যক্তির উপর আমার ঈর্ষা আছে তন্মধ্যে একজন হলেন  ইমাম আযম আবু হানিফা তাঁর ফিকহের কারণে, আর একজন হলেন হাসান ইবনে সালিহের উপর তাঁর তাকওয়ার কারণে।


🔹ইমাম শাফেঈ (র) আরাে বলেন-“কোন ব্যক্তি যদি ইলমে ফিকহে পূর্ণতা অর্জন করতে চায়, সে যেন আবু হানিফা (র)'র পরিবার ভুক্ত হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা (র) এমন লােকদের অন্তর্ভুক্ত যাদের জন্য ইলমে ফিকহ সহজ করে দেওয়া হয়েছে।"


🔹মক্কী ইবনে ইব্রাহীম (র) বলেন- "ইমাম আবু হানিফা (র) ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। তার জ্ঞান থেকে সে ব্যক্তি বিমূখ হতে পারে, যে তাঁকে বুঝতে পারেনি।"


🔹ইস্রাঈল ইবনে ইউনুচ (র) বলেন-“বর্তমান যুগে লােক যেসব বস্তুর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়, ইমাম আবু হানিফা (র) ঐগুলােকে সবচেয়ে বেশী জানতেন।"


🔹ফুযাইল ইবনে আইযয়ায(র) বলেন-“আবু হানিফা (র) একজন ফকীহ ছিলেন এবং ফিকহ বিষয়ে অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তাঁর রাত ইবাদতের মাধ্যমে অতিক্রম হতাে, কথা কম বলতেন। তবে যখন হালাল-হারামের মাসয়ালা আসতাে তখন হক ও সঠিক মাসয়ালাই বলতেন। বিশুদ্ধ হাদিস হলে অনুসরণ করতেন চাই তা সাহাবীর হােক কিংবা তাবেঈর হােক। নতুবা কিয়াস করতেন এবং খুবই উত্তম কিয়াস করতেন।"


🔹হাফিয আব্দুল আযিয ইবনে আবি রাওয়াদ বলেন, যে ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফাকে ভালবাসে সে সুন্নী এবং যে তার সাথে শত্রুতা পােষণ করে সে বদমাযহাবী।


🔹ইমাম শাফেয়ী (র) বলেন, “আমি ইমাম আবু হানিফা (র) থেকে বরকত হাসিল করি এবং তাঁর কবরে যেতাম। যখন আমার কোন প্রয়ােজন বা সমস্যা হতাে আমি দু'রাকাআত নামায পড়তাম এবং তাঁর কবরের নিকট আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম। ফলে দ্রুত সমস্যা সমাধান হয়ে যেত।"


🔹আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ বলেন, যদি আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ইমাম আবু হানীফা (র) এবং সুফিয়ান সাওরী (র) দ্বারা সাহায্য না করতেন তাহলে আমরাও অন্যান্য লোকের মতো অকর্মণ্য হয়ে যেতাম।


🔹একদিন খলীফা হারুনুর রশীদ হযরত ইমাম আবু ইউসুফ (র)- কে বলেন, ইমাম আবূ হানীফা (র)- এর গুণাবলী বর্ণনা করুন। তখন তিনি ইমাম আযমের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ইমাম আযম (র) মুহরিম থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকতেন। অজানা বিষয়ে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোন কথা বলাকে খুব বেশি ভয় করতেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার ইবাদতের ক্ষেত্রে কঠোর সাধনা করতেন। দুনিয়াদারের সামনে কখনো তাদের প্রশংসা করতেন না। অধিকাংশ সময় চুপ থাকতেন এবং ধর্মীয় মাসায়েলের মধ্যে গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে যেতেন। এত বড় জ্ঞানী হওয়া স্বত্তেও তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও বিনয়ী স্বভাবের ছিলেন। যখন তাঁকে কোন প্রশ্ন করা হত তখন তিনি কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ধাবিত হতেন। যদি তার সমাধান কুরআন-হাদীস এর মধ্যে পাওয়া না যেত, তবে কিয়াস করতেন। তিনি না কোন ব্যক্তির কাছ থেকে কোন কিছুর আশা করতেন, না প্রশংসা ব্যতীত কখনো কারো আলোচনা করতেন।


🔹ইমাম আবূ ইউসুফ (র) বলেন, আমি যতগুলো মাসয়ালার মধ্যে ইমাম আযমের সাথে মতবিরোধ করেছি, পরবর্তীতে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে আমার কাছে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, ইমাম আযমের দৃষ্টিভঙ্গি পরকালীন মুক্তির খুব নিকটবর্তী ছিল। কোন কোন সময় তিনি হাদীসের জাহেরী উদ্দেশ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করতেন কিন্তু পরিশেষে এটাই বলতে হতে যে, হাদীসের সূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কে তিনি আমাদের সকলের চেয়ে অধিক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। ইমাম আবূ ইউসুফ (র) বলতেন, আমি আমার পিতার কাছে ইমাম আবূ হানীফার জন্যই প্রথমে দু‘আ চাই।


🔹ইমাম শাফিঈ (র) বর্ণনা করেছেন, একবার ইমাম মালিক (র) থেকে কেউ জানতে চাইলেন যে, আপনি কি ইমাম আবূ হানীফাকে দেখেছেন? তিনি বলেন, আমি উনাকে এমন এক ব্যাক্তি হিসেবে পেয়েছি যে,তিনি যদি একটি ( কাঠ বা পাথরের) স্তম্ভকে স্বর্ণের বলে প্রমাণ করতে চাইতেন তাহলে তাঁর জ্ঞানের জোরে তিনি তা-ই প্রমাণ করে ছাড়তেন।


💛হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্ব:


ইসলামে যে চারটি মাযহাব প্রচলিত আছে এর মধ্যে হানাফী মাযহাব বা ফিকহে হানাফীই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ। ইমাম আ'যম আবু হানিফা নুমান ইবনে সাবিত (র) হলেন এ মাযহাবের প্রবর্তক। তাঁর নামানুসারে এ মাযহাবের নামকরণ করা হয় 'হানাফী মাযহাব বা ‘ফিকহে হানাফী’। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের নিকট এ মাযহাবই সর্বাধিক সমাদৃত। মােল্লা আলী কারী (র) বলেন, “বর্তমান দুনিয়ার এক তৃতীয়াংশ মু'মিন হানাফী মাযহাবের অনুসারী।


উপরােক্ত অভিমত হিজরী দশম শতাব্দীর। বর্তমান বিশ্বে মুসলামনদের প্রায় অর্ধেকই হানাফী মাযহাবের অনুসারী ও অনুরাগী।


✨রদ্দুল মােহতার গ্রন্থে বলা হয়েছে, “মােদ্দাকথা হলাে নিশ্চয় আবু হানিফা নু'মান পবিত্র কুরআনের পর রাসূল(ﷺ)'র সবচেয়ে বড় মু'জিযা। তাঁর ফযীলতের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, তাঁর মাযহাব এতই প্রসিদ্ধ যে, অনেক বড় বড় ইমামগণও তাঁর মাযহাব গ্রহণ করেছেন এবং তৎকাল থেকে আজ পর্যন্ত তার শিষ্য ও অনুসারীরাই ফায়সালা ও বিচার কার্য আঞ্জাম দিয়ে আসছেন। এমনকি হযরত ঈসা (আ.) পৃথিবীতে আগমন করে ইমাম আ'যমের মাযহাব মােতাবেক ফায়সালা করবেন। এটি এই মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য বড় দলীল। 


✨নিশ্চয় ইমাম আবু হানিফা (র)'র মাযহাব অনেক আউলিয়া কিরাম অনুসরণ করেছেন। যেমন-ইব্রাহীম ইবনে আদহাম, শকীক বলখী, মারূফ কারখী, বায়েজীদ বােস্তামী, ফুযাইল ইবনে আয়ায প্রমুখ যাদের সংখ্যা অগণিত। তাঁরা যদি এই মাযহাবে কোন সন্দেহভাজন কিছু পেতেন কখনই তাঁরা এর অনুসরণ, অনুকরণ ও সমর্থন করতেন।


💛আবু হানিফা (র)'র অনুসারীগণের গুনাহ মাফ:


রুদ্দুল মোহতার গ্রন্থে আছে, “ইমাম আবু হানিফা চল্লিশ বছর এশার উযু দিয়ে ফজরের নামায পড়েছেন এবং ৫৫ বার হজ্জ পালন করেছেন আর স্বপ্নে আল্লাহকে একশতবার দেখেছেন যা খুবই প্রসিদ্ধ। তিনি সর্বশেষ হজ্জের সময় বায়তুল্লায় প্রবেশের অনুমতি নিয়ে রাতের বেলায় প্রবেশ করে দু' স্তম্ভের মধ্যখানে ডান পায়ে দাঁড়িয়ে বাম পা ডান পায়ের উপর রেখে অর্ধ খতম তথা পনের পারা কুরআন তিলাওয়াত করেন। তারপর রুকু-সিজদা করে উঠে বাম পায়ের উপর দাঁড়িয়ে ডান পা বাম পায়ের উপরে রেখে পূরাে কুরআন সমাপ্ত করেন।


নামায শেষে অঝাের নয়নে কান্নাকাটি করে বলেন-হে আল্লাহ! আমি তােমার দুর্বল বান্দা, তােমার যথাযথ হক আদায়ে অক্ষম, তবে তােমাকে চেনার মতাে চিনেছি। সুতরাং আমার যাবতীয় অক্ষমতা ও খেদমতের ত্রুটি ক্ষমা করে দাও। তখন বায়তুল্লাহর দিক থেকে গায়েবী আওয়াজ আসল যে, হে আবু হানিফা! তুমি আমাকে চেনার মত চিনেছ এবং উত্তম খেদমত আঞ্জাম দিয়েছ। সুতরাং আমি তােমাকে এবং তােমার অনুসারীদেরকে এমনকি কিয়ামত পর্যন্ত যারা তােমার মাযহাবের অনুসরণ করবে আমি সকলকে ক্ষমা করে দিলাম।


💛ইলমে ফিক্বহের প্রবর্তক ইমাম আ'যম:


ইমাম আবু হানিফা (র) মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমূহ সমস্যার সমাধান কল্পে দীর্ঘ ২২ বছরকাল পর্যন্ত সাধনা করেন এবং তাঁর সুযোগ্য ও বিশিষ্ট ছাত্রদের নিয়ে চল্লিশ সদস্যের একটি ফিকহী বাের্ড গঠন করে কুরআন, হাদিস, ইজমায়ে সাহাবা, ফাতাওয়ায়ে সাহাবা এবং কিয়াসের মাধ্যমে ব্যাপক গবেষণা করে বিষয় ভিত্তিকভাবে ফিকহের এক বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেন যা ‘ইলমে ফিকহ' নামে পরিচিত ও সুবিদিত। 


সুদীর্ঘ ২২ বছর দিবারাত্রির পরিশ্রম ও সাধনা-গবেষণার পর ইমাম আবু হানিফা (র)'র এ ফিকহ সম্পাদনা পরিষদের মাধ্যমে ‘মাজমুয়ায়ে ফিকহ' তৈরি হয়ে আলিমদের হাতে পৌছে। এ মজমুয়ায় তিরাশি হাজার মাসয়ালা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে আটত্রিশ হাজার ইবাদত সম্পৰ্কীয়, এবং পঁয়তাল্লিশ হাজার পরস্পর লেনদেন, চুক্তি ও শান্তি সম্পর্কিত ছিল। তিনি একাজ আরম্ভ করেছিলেন ১২১ হিজরীতে এবং ১৪৪ হিজরীর পূর্বেই তা সমাপ্ত হয়। কিন্তু এরপরও এতে মাসয়ালা সংযােজন হতে থাকে। অবশেষে ফিকহে হানাফীর মাসয়ালা সংখ্যা পাঁচ লক্ষে গিয়ে পৌছাল।


✨আল্লামা খাওয়ারেযমী (র) বলেন, “বলা হয় যে, ইমাম আবু হানিফা (র)'র লিপিবদ্ধ মাসাইলের সংখ্যা পাঁচ লক্ষে পৌছেছে। তাঁর ও তাঁর ছাত্রদের গ্রন্থরাজিই এর প্রমাণ বহন করে।" 


✨আল্লামা সুয়ূতী শাফেঈ (র) বলেন, “ইমাম আবু হানিফাই সর্বপ্রথম এই শরীয়ত তথা ইলমে ফিকহ সংকলন করেন এবং তা অধ্যায় হিসাবে বিন্যস্ত করেন। তারপর এ পথে তাঁর অনুসরণ করেন ইমাম মালিক ইবনে আনাস (র)। ইমাম আবু হানিফা (র) কে কেউ এ বিষয়ে পেছনে ফেলতে পারেনি।"


💛ইমাম আবু হানিফা (র)'র ইবাদত ও রিয়াযাত:


আল্লামা যাহাবী (র) বলেন, তাঁর রাতের তাহাজ্জুদের নামাযের জন্য দাঁড়ানাে এবং ইবাদত করা মুতাওয়াতির বর্ণনা দ্বারা সাব্যস্ত আছে। বরং ত্রিশ বছর যাবৎ সারা রাত ইবাদত করতেন এবং এক এক রাকাতে এক খতম কুরআন তিলাওয়াত করেছেন এবং যে স্থানে তিনি ইন্তেকাল করেছেন সে স্থানে সত্তর হাজার বার কুরআন শরীফ খতম করেছেন।


ইমাম আবু ইউসুফ (র) বলেন-তিনি প্রতি রাতে ও দিনে এক খতম করে কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং রমযান মাসে ঈদের দিন পর্যন্ত মােট বাষট্টি খতম কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি দানবীর ছিলেন, শিক্ষাদানে বড় ধৈর্যশীল ছিলেন। তাকে যা কিছু বলা হতাে তিনি ধৈৰ্য্যধারণ করতেন, রাগ হতেন না কখনাে। আমি তাঁকে বিশ বছর যাবত দেখেছি যে, তিনি রাতের প্রথমাংশে উযূ করতেন ঐ উযূ দিয়ে ফজরের নামায আদায় করেছেন। আর যারা আমার পূর্বে তার খেদমতে ছিলেন তারা বলেন চল্লিশ বছর থেকে তার অবস্থা এরূপ।


✨মিসআর (র) বলেন-“আমি তাঁকে দেখলাম যে, ফজরের নামায পড়ে ছাত্রদেরকে শিক্ষাদানের জন্য বসতেন তারপর যােহরের নামায পড়ে পুনরায় আসর পর্যন্ত বসতেন। তারপর আসরের পর মাগরীব পর্যন্ত, মাগরীবের পর এশা পর্যন্ত শিক্ষাদান করতেন। আমি মনে মনে বললাম তিনি সারাদিন বিদ্যা শিক্ষায় অতিক্রম করেন কিন্তু ইবাদত কখন করেন? আমি তা অবশ্যই দেখবাে। যখন লােকেরা ঘুমিয়ে পড়ল তখন তিনি দুলহার ন্যায় পাক-পবিত্র হয়ে মসজিদে গমণ করেন এবং ইবাদতে ফজর পর্যন্ত মশগুল ছিলেন। তারপর বের হয়ে পােশাক পরিবর্তন করে ফজরের নামায পড়ে যথানিয়মে পাঠদানে ব্যস্ত হয়ে গেলেন এবং এশা পর্যন্ত তা চলতে থাকল। তখন মনে মনে বললাম আজ রাতও আমি তাঁকে পর্যবেক্ষণ করবাে। দেখলাম সে রাতেও তিনি যথানিয়মে ইবাদতে মশগুল ছিলেন। তখন আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করলাম যে, আমৃত্যু আমি তাঁর সাহচর্য পরিত্যাগ করবোনা।


✨ইমাম সাহেব প্রতি রাত্রে তিনশত রাকয়াত নফল নামায পড়তেন। একদা তিনি চলবারকালে শুনতে পেলেন, এক মহিলা অপর মহিলার কাছে বলছে, এ লােকটি প্রতি রাত্রে পাঁচশত রাকয়াত নফল নামায পড়ে। সে দিন থেকে তিনি প্রতি রাতে পাঁচশত রাকয়াত নফল নামায পড়া শুরু করলেন। 


🔹তাঁর এক অনন্য নিয়ম ছিল, কোন কঠিন মাসয়ালা উপস্থিত হলে অন্ততঃ চল্লিশ বার কোরআন খতম করে তিনি তার সমাধান করতেন।


🟡উপদেশ:


দাউদ তায়ী (র) যখন শাসনকর্তার পদ লাভ করলেন, তখন তিনি হযরত ইমাম সাহেবের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, এখন আমার কি করা কর্তব্য বলুন? তিনি বললেন, এখন তােমার ইলেমানুরূপ কাজ করে যাও। কেননা যে ইলেমানুরূপ কাজ না করেনা, তার দেহ প্রাণহীন মাংস পিণ্ডের মত।


🟡তাকওয়া ও পরহেযগারী:


তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতির সারকথা এই যে, প্রত্যেক ঐ বিষয়কে ছেড়ে দেওয়া যার কারণে দ্বীনের মধ্যে কোন প্রকার সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এদিক থেকেও ইমাম আবু হানীফার স্তর অনেক উপরে ছিল। যে বিষয়ের মধ্যে সামান্যতম ত্রুটি পরিলক্ষিত হত, তিনি তা থেকেও সম্পূর্ণরুপে দূরে থাকতেন।


✨মক্কী ইবনে ইব্রাহীম (র) বলেন, “আমি কূফাবাসীদের মজলিসে বসেছি, তাদের মধ্যে ইমাম আ'যমের চেয়ে অধিক পরহেযগার কাউকে দেখিনি।"

 

✨হাসান ইবনে যিয়াদ (র) বলেন, খােদার শপথ! ইমাম সাহেব কোনদিন কোন খলীফার উপঢৌকন গ্রহণ করেননি। তিনি একদা তার ব্যবসায়িক শরীকদারের নিকট ব্যবসার কিছু কাপড় পাঠিয়েছিলেন। এতে একটি কাপড়ে ক্রটি ছিল। তিনি শরীকদারকে বলেছিলেন, এই কাপড় বিক্রির সময় ত্রুটির কথা বলে বিক্রি করবে। কিন্তু শরীকদার তা বিক্রি করে দিলেন কিন্তু ভুলে ক্রটির কথা উল্লেখ করেননি এবং ঐ ত্রুটিযুক্ত কাপড় কার কাছে বিক্রি করেছে তাও সঠিকভাবে মনে ছিলনা। যখন ইমাম সাহেব এ ব্যাপারে অবহিত হলেন, তখন তিনি সন্দেহের কারণে ঐ দিনের বিক্রিত সমস্ত মূল্য সাদকা করে দিলেন, যা তৎকালীন ত্রিশ হাজার দিরহাম ছিল এবং ঐ শরীকদার থেকে পৃথক হয়ে গেলেন।


✨একদা হযরত ইমাম সাহেব বাজারে যাবার পথে সামান্য কাদামাটি কাপড়ে লেগে গেল। তিনি তখনই নদীতে গিয়ে কাপড়ের কাদামাটি ভাল করে ধুয়ে ফেললেন। কেহ তখন তাকে বললেন, হুযুর! আপনি যে পরিমাণ ময়লা জায়েয রেখেছেন, এতাে তার চেয়ে কম, না ধুলেও তাে চলত। তিনি জবাব দিলেন এটা হল ফতােয়ার কথা আর ওটা হল পরহেজগারী।


🟡ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল:


ওয়ালিদ ইবনে কাসিম বলেন, ইমাম আবু হানীফা (র.) ছিলেন স্বভাবজাত দানশীল। নিজ ছাত্রদের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল রাখতেন এবং তাদের প্রতি ছিলেন অধিক সহানুভূতিশীল। 


🔸কাসিম (রা.) বলেন, ছাত্রদের প্রতি কোন উস্তাদের ততটুকু খেয়াল ছিল না, যতটুকু ছিল ইমাম আবু হানীফার। কোন ছাত্রের শরীরে মাছি বসাও তিনি বরদাশত করতে পারতেন না। একবার তাঁর এক শাগরিদ ছাদের উপর থেকে পড়ে গেল। এটা শুনে তিনি এত জোরে চিৎকার দিলেন যে, মসজিদে অবস্থানকারী সকলেই শুনতে পেল সেই আওয়াজ। তারপর তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় খালি পায়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, যদি এ বিপদ সরিয়ে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হত তাহলে অবশ্যই তা সরিয়ে নিতাম। শাগরিদ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তিনি সকাল বিকাল তাকে দেখতে যেতেন।


💛মুহুর্তেই মাফ করে দিলেন ৪ হাজার দিরহাম:


একদিন ইমাম আবু হানীফা (র.) পথে চলছিলেন। এক ব্যক্তি তাঁকে দেখামাত্র নিজেকে আড়াল করে নিল এবং লুকিয়ে আরেক রাস্তায় চলতে লাগল। এটা টের পেয়ে ইমাম আবু হানীফা (র.) তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এমন করলে কেন? সে বলল, আপনি আমার কাছে ৪হাজার দিরহাম পাবেন। অভাবের কারণে সেই ঋণ শােধ করতে পারিনি। এ কারণে আপনার মুখােমুখি হতে লজ্জা পাই। দান-দক্ষিণার সেই মূর্তপ্রতীক তাঁর ওজর শুনতেই মাফ করে দিলেন চার হাজার দিরহামের ঋণ। বললেন, ভবিষ্যতে আমার কারণে নিজেকে লুকিয়ে চলবে না। আমার পক্ষ থেকে তােমার অন্তরে যে ভয়ের সঞ্চার হয়েছিল তার জন্য আমাকে ক্ষমা করে দাও।


💛মায়ের প্রতি ইমাম আবু হানীফা (র.) এর মুহাব্বত:


কুফার গভর্নর ইবনে হুবাইরা ইমাম আবু হানীফা (র.) কে কাজীর পদ গ্রহনের প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। ফলে ইবনে হুবাইরা তাকে ১১০টি কোড়া মারেন। ইমাম আবু হানীফা (র.) বলেন, কোড়া মারার কারণে আমি সেই পরিমান কষ্ট পাইনি যেই পরিমান কষ্ট পেয়েছিলেন কোড়া মারার ঘটনা শুনে আমার মা ব্যথিত হওয়ায়। তিনি বিরক্ত হয়ে আমাকে বলেছিলেন, হে নােমান! যেই ইলমের কারণে তােমাকে এই দুর্দিন দেখতে হল, সেই ইলম থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নাও। আমি তাঁকে এই বলে স্বান্তনা দিলাম যে, আমি যদি আমার ইলম দ্বারা দুনিয়া অর্জনের ইচ্ছা করতাম, তাহলে প্রচুর পরিমানে অর্জন করতে পারতাম। আমি ইলম শিক্ষা করেছি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে এবং পরকালে নাজাতের জন্য। কাজেই দুনিয়া আমার সাথে যে কোন আচরণই করুক না কেন, তাতে আমার কোন পরােয়া নাই। 


🟡কিতাবুল আছার :


ইমাম আযম (র) হাদীস পড়ানোর সময় যে সমস্ত হাদীস বর্ণনা করতেন তাঁর সুযোগ্য গর্বিত ছাত্র কাযী আবূ ইউসুফ, মুহাম্মদ ইবন হাসান শায়বানী, যুফর ইবন হুযায়ল এবং হাসান ইবন যিয়াদ উক্ত হাদীসগুলোকে ‘হাদ্দাসানা’  এবং ‘আখবারানা’ ধরনের শব্দ দিয়ে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। ইমাম আযম (র)  নিজের বর্ণনাকৃত হাদীসগুলোকে পরিপূর্ণ করার পরে সেগুলোকে সমষ্টিগতভাবে রুপ দিয়ে নামকরণ করেছেন ‘কিতাবুল আছার’। 


🔹ইমাম আযম (র)- এর ছাত্র সংখ্যা যেহেতু অসংখ্য ছিলেন সেহেতু ‘কিতাবুল আছার’-এর পান্ডুলিপিও ছিল অনেক। তবে তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ পান্ডুলিপি নিম্নোক্ত চারটি:-


 (১) কিতাবুল আছার—ইমাম আবূ ইউসুফ (র) কর্তৃক বর্ণিত; 

(২) কিতাবুল আছার—ইমাম মুহাম্মদ (র) কর্তৃক বর্ণিত;

(৩) কিতাবুল আছার—ইমাম যুফর (র) কর্তৃক বর্ণিত; 

(৪) কিতাবুল আছার ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ (র) কর্তৃক বর্ণিত।


এ চারটি পান্ডুলিপির মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রসিদ্ধি  লাভ করেছে ইমাম মুহাম্মদ (র) রচিত কিতাবটি।


🟡তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী:


১.كتاب العلم والمتعلم (কিতাবুল ইলম ওয়াল মুতা'আল্লিম) ইমাম আ'যম (র) এই গ্রন্থখানি আকাইদ ও নসীহতের উপর শিষ্যের প্রশ্ন ও উস্তাদের উত্তর পদ্ধতিতে রচনা করেছেন।

২. كتاب الفقه الاكبر (কিতাবুল কিক্বহিল আকবার) আকাইদ বিষয়ে রচিত গ্রন্থখানা আবু মুতী বলখী তাঁর থেকে রেওয়ায়েত করেছেন।

৩. كتاب الوصايا (কিতাবুল ওয়াসায়া)

৪.كتاب المقصود (কিতাবুল মাক্বসুদ)

৫.كتاب الاوسط (কিতাবুল আওসাত্ব)

৬. كتاب الاثار (কিতাবুল আছার)


ইমাম আ'যমের কিতাবুল আসারের হাদিস সমূহকে নির্বাচিত করে তাঁর ওস্তাদগণের তারতীব অনুযায়ী হাদিস একত্রিত করে মাসানিদে ইমাম আ'যম রচিত হয়েছে। এ সব মুসনাদের সংখ্যা প্রায় ত্রিশখানা।


🟡ওফাত শরীফ:


রাসুল (ﷺ)- ইরশাদ করেছেনঃ- 


اشد الناس بلاء الانبياء ثم الامثل فالامثل-


"কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আল্লাহর নবীগণ। তারপর যারা তাঁদের নিকটতম এবং তাদের পরবর্তী নিকটতমগণ"


খলীফা আবু জাফর মনসুর ইমাম আবু হানিফা (র)কে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করতে বললে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন। কিন্তু খলীফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করাতে তিনি তার উপর রাগ করে শপথ করলেন যে, এই পদ গ্রহণ না করলে আপনাকে বন্দী করা হবে এবং অপদস্ত করা হবে। এতেও তিনি সম্মতি প্রকাশ না করলে তাঁকে জেল খানায় বন্দী করা হয় এবং প্রতিদিন বাইরে এনে দশটি করে বেত্রাঘাত করা হয়।


এভাবে দশদিন যাবৎ লাঞ্ছিত হওয়ার পর আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন এবং এরপর পঞ্চম দিন ইন্তেকাল করেন।


🔸কেউ কেউ বলেন-তাঁকে খাবারে বিষ দেয়া হয়েছিল। তিনি তা খেতে অস্বীকার করে বলেন, আমি জানি যে, এখানে কি দেওয়া হয়েছে। আমি এ খাবার খেয়ে আমার হত্যাকারীর হত্যায় সহযােগী হতে চাই না। সুতরাং আমি তা পানাহার করবাে। কিন্তু জোর জবরদস্তী তা তার মুখে ঢেলে দিলে তিনি সিজদা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।


তিনি ১৫০ হিজরী সনে ৭০ বছর বয়সে রজব অথবা শাবান মাসে ইন্তেকাল করেন।


✨তাঁর জানাযায় প্রথম জামাতে পঞ্চাশ হাজারের অধিক লােক অংশগ্রহণ করে। এরপর আরাে লােকজন আসতে থাকে। ফলে মােট ছয়বার জানাযার নামায পড়তে হয়েছিল। সর্বশেষ জানাযায় তাঁর পুত্র হযরত হাম্মাদ (র) ইমামতি করেন। অবশেষে অধিক লােকের কারণে আসরের পরেও দাফন কাজ সমাপ্ত করতে সক্ষম হয়নি। দাফনের পরেও বিশদিন পর্যন্ত লােকজন তাঁর কবরে জানাযার নামায পড়েছেন। তিনি অসিয়ত করেছিলেন যে, তাঁকে যেন ‘খিযরান’ নামক কবরস্থানের পূর্বদিকে দাফন করা হয়। কেননা তাঁর মতে সেখানকার ভূমি পাক-পবিত্র এবং গযবমুক্ত ছিল। এই অসিয়ত অনুযায়ী ঐ কবরস্থানের পূর্ব পার্শ্বে তাঁকে দাফন করা হয়।


♦️তথ্যসূত্র:


১.আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া

২.বিষয়ভিত্তিক কারামতে আউলিয়া

৩.তাযকিরাতুল মুহাদ্দিসীন

৪.তাযকিরাতুল আউলিয়া

৫.শরহে মুসনাদে ইমাম আ’যম আবু হানিফা (র)

কোন মন্তব্য নেই

Be alert before spamming comments.

Blogger দ্বারা পরিচালিত.