নেমেসিসের মাহের ভাইয়ের দ্বীনে ফেরার গল্প!

 নেমেসিসের মাহের ভাইয়ের দ্বীনে ফেরার গল্প!



একজন মিউজিশিয়ান হিসেবে কি ছিল না তার! লম্বা চুলে দর্শককে আকৃষ্ট করা, হাতে দামী গিটার, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট! হয়তো আরো অনেক কিছু ছিল - মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন থেকে টাকা উপার্জন, সারাবিশ্বে ফ্যানদের মাঝে নিজেকে পরিচিত করে তোলা ইত্যাদি। কিন্তু, আধুনিকতার এই যুগে এসব কিছুর মায়া ছেড়ে, যশ-খ্যাতি-ফেম কামানোর এত সুযোগ থাকা স্বত্বেও কিসের টানে একজন মিউজিশিয়ান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে? কিভাবে একজন মিউজিশিয়ান গিটার ছেড়ে হাতে পবিত্র কুরআন তুলে নিতে পারে?

বলছিলাম মাহের খানের কথা! বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আল্টারনেটিভ রক মিউজিক অ্যাডিক্টেড এমন কেউ নেমেসিস মিউজিক ব্যান্ডের নাম শুনেনি এটা কল্পনাতীত। এই ব্যান্ডের ফাউন্ডার মেম্বার এবং লীড গিটারিস্ট ছিলেন মাহের খান। ২০১১ সালে যখন নেমেসিস তাদের অ্যালবাম "তৃতীয় যাত্রা" বের করে তখন মাহের খান বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট এবং এই অ্যালবাম রিলিজের পর ব্যান্ড মিউজিকের সকল ফ্যানদের মনে মাহের ঢেউ তুলেছিল। কিন্ত সবাইকে অবাক করে দিয়ে তার পরের বছরই ২০১২ সালে ধর্মের টানে মাহের খান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি কে পুরোপুরি বিদায় বলে দেন।

ছোটকাল থেকেই মাহের খানের ধর্মের প্রতি টান ছিল, নিয়মিত সালাতও আদায় করতেন। একটা সময় তিনি মিউজিক জগৎ এ প্রবেশ করেন, তখনও সালাতকে প্রাধান্য দিতেন, তারপর গান করতেন। তখন মনে করতেন, ঠিক আছে গান করছি এবং নামাজও পড়ছি। কিন্তু, একটা সময় তিনি খুঁজতে থাকা সঠিক পথ পান এবং পুরোপুরি গানের জগত ছেড়ে দেন।

আরো পড়ুন: আযানের উত্তর দেয়ার ফযীলত

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যখন আমি পিছনে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি ইসলাম শুধু নামাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর আরো অনেক দিক রয়েছে। যখন আপনি মিউজিকের প্রতি মনোনিবেশ করবেন, তখন এটি আপনাকে আল্লাহর স্মরণ হতে দূরে সরিয়ে দিবে। যদিও আমি তখন সালাত আদায় করতাম, কিন্ত আমি ইসলামের অন্যান্য বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে পারতাম না, কারণ আমার সময় ছিল না। আমার অন্তরে সবসময় চিন্তা করতাম কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না, মিউজিক ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করতাম মনে মনে, কিন্ত যেকাজ আমি সবসময় করে এসেছি তা ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল।

আর যদি মিউজিক ছেড়ে দেওয়ার কোনো কারণ থাকতো, তাহলে তা হতো মিউজিক থেকে ভালো এবং উত্তম কিছুর প্রতি ভালোবাসা। আমার বেলায় বিষয়টি ছিল আল্লাহ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। সত্যি বলতে, অন্য কোনো কারণ যদি হতো তাহলে হয়তো আমি মিউজিক ছাড়তে পারতাম না।

পরিশেষে আমার জীবন যেমন ছিল এখনকার তুলনায় তার একমাত্র পার্থক্য হিদায়াত। যদি আল্লাহ আপনাকে হিদায়াত করেন, তাহলে আপনার আর কোনো চিন্তা নেই। আপনি যদি সর্বোত্তম ব্যক্তি ও হন তাহলে ও আপনার প্রয়োজন আল্লাহর পথনির্দেশনার। সুতরাং যেই বিষয়টি আমি সর্বপ্রথম কাউকে উপদেশ দিবো তা হল আল্লাহর কাছে হিদায়াতের জন্য দুআ করা, তারপর বাকি কিছু।

এবং 'বন্ধুদের চাপ'। যে প্রশ্নটির আমার সবচেয়ে বেশী সম্মুখীন হতে হয় তা হল, "মাহের ভাই, মিউজিক কেন ছাড়লেন?" যে আপনার মতো একই ধারার চিন্তা চেতনা করে না, তাদেরকে এটি বুঝানো কষ্টকর। কিন্ত আমি সবসময়ই বলি, "ভালোর জন্য এটি করেছি। কারণ আল্লাহ আমাকে পথ দেখিয়েছেন, আশা করি আল্লাহ আপনাকেও পথ দেখাবেন যাতে করে আপনিও একদিন অনুধাবন করতে পারেন..."

অন্য একটি সাক্ষাৎকারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় এই হঠাৎ পরিবর্তন আপনাকে কিভাবে প্রভাবিত করে?

    তিনি বলেন, "এটি জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা আগে যা ছিল এবং এখন যা হয়েছে তাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। জীবনের উদ্দেশ্য একবারে প্রকৃত বাস্তব কিছু বোঝাতে শুরু করলে, তখন বাকি সমস্ত তার পিছনেই থাকবে।" 


তাকে আরো জিজ্ঞেস করা হয় যারা নতুন করে ইসলামের পথে আসতে চাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য কি বলবেন?

তিনি বলেন, "সব ধরনের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা ই উপকারী নয়। আপনার সময় এবং প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করার মতো কিছু জিনিস রয়েছে, যেগুলো আপনার এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবার পরেও আপনার উপকার করবে। খাঁটি উৎস রয়েছে এমন তথ্য গ্রহণ করুন এবং যার খাটি উৎস নেই তা সব বাতিল করুন। আপনি যা শুনেছেন তা বিশ্বাস করবেন না, এবং কুরআন পড়ুন।"

একটা সময় মাহের খান ব্যস্ত ছিলেন কনসার্ট মাতাতে, আর এখন তিনি ব্যস্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে, আলহামদুলিল্লাহ। মাহের খান এই দেশের সকল মিউজিক ভক্ত, মিউজিক এর সাথে জড়িত লোক এবং যারা ভবিষ্যতে এ পথে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের সকলের চিন্তা শক্তিকে আবারো স্মরণ করিয়ে দিলেন আসলে কোন পথটি সকল বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত, কোন পথটি সহজ-সরল-সুন্দর। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ কয়েকদিন আগে সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা! যার কোটি টাকা ছিল, বাড়ি-গাড়ি, সম্পদ, নারী সব ছিল কিন্তু মনের সুখ ছিল না।


    আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, "তোমরা জেনে রেখ যে, পার্থিব জীবনতো ক্রীড়া কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক অহংকার প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়; ওর উপমা বৃষ্টি, যদ্বারা উৎপন্ন শস্য সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর ওটা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি ওটা পীতবর্ণ দেখতে পাও; অবশেষে ওটা খড়কুটায় পরিণত হয়। পরকালে (অবিশ্বাসীদের জন্য) রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং সৎপথ অনুসারীদের জন্য রয়েছে আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।"

[সূরা হাদিদ : আয়াত ২০]


    আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, "আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জগতের ভোগ বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সে সব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না, আপনার পালন কর্তার দেয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী"

[সূরা ত্বহা : আয়াত ১৩১]


    "জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়"

[সূরা রাদ : আয়াত ২৮]

পরিশেষে যারা গানের জগৎে আসতে চাচ্ছেন বা নিয়মিত গান শুনেন, আসক্ত হয়ে গেছেন বলেন তাদের প্রতি -

সত্য জানার এবং বোঝার পর একজন মিউজিশিয়ান যদি নিজেকে এভাবে পরিবর্তন করে ফেলতে পারে তাহলে কেন সাধারণ একজন শ্রোতা বা সাধারণ গায়ক হয়ে আপনি তা পারবেন না?

উঠে দাড়ান। সকল অবাধ্যতা ও আধুনিকতার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলুন। আর আস্বাদন করুন সত্যিকার শান্তির স্বাদ, যেখানে আপনার সঙ্গী হিসাবে রয়েছে অনন্তকালের সফলতা, ইনশা আল্লাহ।

কোন মন্তব্য নেই

Be alert before spamming comments.

Blogger দ্বারা পরিচালিত.