রূহ্     কি       জিনিস,      রূহের হাকীকত কী? বিভিন্ন মতামত

1
235
রূহ্     কি       জিনিস,      রূহের হাকীকত কী? বিভিন্ন মতামত
রূহ্     কি       জিনিস,      রূহের হাকীকত কী? বিভিন্ন মতামত
Reading Time: 3 minutes

রূহ্     কি       জিনিস,      রূহের হাকীকত কী?

প্রশ্নঃ দেহ   থেকে রূহ্  পৃথক হয়ে  যাবার   পর যখন সে  একা   হয়ে যায়-  তখন  কিভাবে  একরূহ্  অন্যরূহ্ হতে পার্থক্য  করা যায়? কিভাবে রূহ্সমূহ বিভিন্ন রূপ ধারণ করে    অন্য    রূহের    সাথে   পরস্পর   মিলিত   হয়   এবং  পরিচিত হয়? দেহমুক্ত রূহ্সমূহ কি পূনরায় অন্য কোন দেহে  প্রবেশ  করে?  শরীরবিহীন  রূহের  প্রকৃত  অবস্থা  কি? রূহের অবস্থান কোথায়?

উত্তরঃ বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। দার্শনিকদের দর্শন পড়ে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুবই কঠিন। বিশেষ করে যারা বলেন- রূহের কোন সূরত নেই। রূহ্ কোন  পদার্থ নয়, ইহা সৃষ্টির অন্তর্ভূক্তও নয়, আবার বহির্ভূতও নয়, রূহের কোন  পরিমাপ  নেই,   রূহের  কোন   দৈহিক   রূপ  নেই- ইত্যাদি। দার্শনিকদের   নীতিমালা অনুযায়ী এর  জবাব দেয়া মোটেই সম্ভব নয়।
রূহ্ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামতঃ

(১) একদল কালাম বিশারদ বলেন- “রূহ্ হচ্ছে দেহের অন্যান্য     অঙ্গের    মতই    একটি      পরনির্ভরশীল    অঙ্গ। যতক্ষন    রূহ্   দেহে     অবস্থান   করে-   ততক্ষণ    উহাকে  অন্যান্য অঙ্গ থেকে পার্থক্য করা যায়। কিন্তু দেহ থেকে মুক্ত হয়ে গেলে আর পার্থক্য করা যায় না- বরং তাঁদের মতে-   তখন   রূহ্   বলতে   আর   কিছুই   থাকেনা।   উহা  তখন অস্তিত্বহীন হয়ে যায়-  যেমন দেহের অন্যান্য অঙ্গ অস্তিত্বহীন ও ধবংশ হয়ে যায়। ইহাকে আরবীতে আরয (عرض)    বলা   হয়-  অর্থাৎ   বাহ্যিক  গুণ   বিশেষ।    এই শ্রেণীর        দার্শনিকদের       দর্শনের         সমাধান       তাঁদের নীতিমালার ভিত্তিতে দেয়াও সম্ভব নয়।

10-Minute-Madrasah-Group-Join

(২)    হাঁ-    কোরআন     সুন্নাহ্,     ওলামাদের     ব্যাখ্যা     ও বিবেকবুদ্ধি মোতাবেক রূহের প্রকৃতি নির্ণয় করা সম্ভব। কোরআন-সুন্নাহ  ও অন্যান্য  দলীলাদির দ্বারা প্রমাণিত  হয়েছে যে,  রূহ্ হচ্ছে এমন  এক পৃথক যাত বা  সত্ত্বা-    যা  স্বয়ং  অস্তিত্ববান  হতে  পারে।  উপরে   গমন   করতে পারে, নিচে    নামতে পারে,  কোন কিছুর  সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং  বিচ্ছিন্নও হতে পারে। দেহ  হতে বের  হয়ে রূহ্ অন্যত্র গমন করতে পারে। মোদ্দা কথা হলো- অন্যান্য সৃষ্টির মত   রূহ্ও   একটি পৃথক  সৃষ্টি ও  সত্বা। সচলও  অচল   হওয়া  ইহার   বৈশিষ্ট।   ইহার  বহু   নযীর পেশ করা যেতে পারে। যেমন-

(ক ) মৃত্যুকালে যখন দেহ থেকে রূহ্ পৃথক করে নেয়া হয়- তখন ফিরিস্তারা বলে-
یا   أَیَّتُهَا   النَّفْسُ   الْمُطْمَئِنَّةُ   ارْجِعی   إِلى   رَبِّکِ    راضِیَةً  مَرْضِیَّةً
”হে   প্রশান্ত   আত্মা,   তুমি   তোমার   প্রভুর   দিকে   ফিরে  চলো। তুমি ছিলে রাযী, আল্লাহ্ও তোমার প্রতি রাযী”। বুঝা  গেল-  শরীর  থেকে  রূহ্  বিচ্ছিন্ন  হওয়ার  সময়েই  একথা বলা হয়। (সুরা ফজরঃ ২৭-২৮)
(খ) ছুরা ইন্ফিত্বার-এ আল্লাহ্পাক শরীরের এবং রূহের সংযোগ সম্পর্কে এরশাদ করেন-
الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ
(কিভাবে  তার  নাফরমানী  করছো)  -  “যিনি  তোমাকে  (শরীরকে) সৃষ্টি   করে  তার  মধ্যে রূহ্  স্থাপন  করেছেন এবং ঠিকঠাকভাবে সংযোজন কাজ সমাধা করেছেন”। (ইন্ফিত্বারঃ ৭)

বুঝা গেল-  শরীর  গঠনের  চারমাস পর  রূহের আগমন হয়।   তাই   শরীর   ও    রূহ্  দুই   জিনিস    বা   দুই  সত্বা। শরীরের  বয়স   চারমাস   বেশী।   রুহের  বয়স  চারমাস কম।

উপরোক্ত দুটি   আয়াতের  দ্বারা বুঝা  যাচ্ছে-  রূহ্ শরীর থেকে  সূরতধারী  একটি  বস্তু বের করে-  যার দ্বারা  রূহ্ সমূহের পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য করা যায়। পবিত্র রূহ্ পবিত্র দেহে  এবং অপবিত্র রূহ্ অপবিত্র দেহে   অবস্থান করে। হাদীসে বর্ণিত  আছে- ‘‘মালাকুত মউত  মুমিনের রূহ্     বের    করে   অন্যান্য    ফিরিস্তাদের    কাছে   হস্তান্তর করে। তখন ঐ রূহ্ থেকে মেশকের চেয়ে বেশী সুগন্ধি পাওয়া  যায়’’।  এতেই  বুঝা   গেল-  রূহ্   গুন   নয়-  বরং যাত বা   পৃথক  সত্বা।  কেননা,  গুণের কোন সুগন্ধি  হয় না  এবং  এক   হাত  থেকে     আরেক  হাতেও  নেয়া  যায় না।

হাদীসে  বর্ণিত   হয়েছে-  “পবিত্র  রূহ্  আকাশের    দিকে উঠতে      থাকে।     তখন     আসমান     যমীনের      মধ্যকার ফিরিস্তারা তাঁকে সালাম জানায়। ঐ পবিত্র রূহের জন্য প্রত্যেক   আকাশের   দরজা   খুলে   দেয়া     হয়।   এভাবে পবিত্র   রূহ্  এক  আকাশ  থেকে  অন্য   আকাশে  উঠতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হয়।  তখন  আল্লাহ্  তায়ালা  তাঁর  নাম  ইল্লিয়্যিনের  দফতরে  লিখার     আদেশ     দেন।      এরপর      কবরে     তাঁর      রূহ্   ছাওয়াল-জওয়াবের    জন্য    ফেরত   পাঠান    হয়।    আর কাফেরের                রূহ্কে                নিক্ষেপ                করা                হয়  অপমানজনকভাবে।   অতঃপর  তার রূহ্  কবরে পতিত হয় ছাওয়াল জাওয়াবের জন্য”। (মুসনাদে আহমদ)

(গ) হাদীস শরীফে মোমেনদের রূহের অবস্থান সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে-
نسمۃ المؤمن وھی روحہ طائر یعلق فی شجرۃ الجنۃ حتی یردھا اللّٰہ الی جسدہ ۔
“মোমেনদের রূহ্ পাখীর সুরতে বেহেস্তের  গাছে  গাছে ঘুরে     বেড়ায়,     ফল     খেতে     থাকে।     হাশরের     সময়  আল্লাহ্পাক   তাঁদের   রূহ্    শরীরে    ফেরত   পাঠাবেন”।  (মুসনাদে আহমদ ৩য় খন্ড ৪৫৫ পৃঃ)।

(ঘ) ইমাম আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী (রহঃ) লিখেছেন-
ارواح  الشھداء  فی  جوف    طیر   خضر  لھا  قنادیل   معلقۃ بالعرش تسرح من الجنۃ حیث شاء ت۔
”শহীদগণের পবিত্র রূহ্ সবুজ পাখীর সূরতে জান্নাতের যথায় ইচ্ছা বিচরণ করে। তাঁদের জন্য রয়েছে আরশে লটকানো ঝালর বাতি”। (তায্কিরাহ্)।

(ঙ)  কাফেরদের   রূহের    অবস্থান   সম্পর্কে   কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-
النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا
“কাওমে     ফিরাউন-এর    রূহ্   সমূহকে    সকাল   সন্ধ্যায় জাহান্নামে পেশ করা হবে”। (কুরআন ৪০:৪৬)
উপরে  বর্ণিত  হাদীসে  পরিস্কারভাবে  প্রমানিত  হয়েছে  যে, মোমেন ও শহীদগণের রূহ্সমূহ জান্নাতে খানাপিনা খায়   এবং  যথায়  ইচ্ছা   ভ্রমন  করে।  কাফেরদের    রূহ্ সকাল সন্ধ্যায় দোযখে পেশ করা হয়। এতেই প্রমাণিত হলো- প্রত্যেক রূহ্  শরীর  থেকে   বিচ্ছিন্ন হয়েও  পৃথক সত্বা নিয়ে অবস্থান করে এবং শরীরের চেয়ে ভাল করে তাকে   চিনা  যায়।  কেননা,  এক  শরীর  অন্য  শরীরের  মত  হতে  পারে-  কিন্তু  এক  রূহ্  অন্য    রূহের   মত  হয় না।

দেখুন-    ফিরিস্তারা   রূহানী   সূরত    ধারণ    করা   সত্বেও তাঁদেরকে   ভালভাবেই পার্থক্য করা  যায়।   জ্বীন জাতি আগুনের       সৃষ্টি      হওয়া        সত্বেও      তাদেরকে       পৃথক পৃথকভাবে   চেনা   যায়।   সুতরাং   মানুষের   রূহ্   আরো  উত্তমরূপে চেনা যাবে। কেননা, রূহ্ হলো একটি পৃথক সত্বা।  আরো   বুঝা গেল-  নেক্কারদের  রূহ্ ইল্লিয়্যিন বা উর্দ্ধজগতে      বিচরণ      করে      এবং      বদ্কারদের      রূহ্  সিজজীন বা   নিম্ম জগতে পতিত  হয়,   আবার কবরের সাথেও সকল রূহের সংযোগ থাকে।

হাকীকতে রূহ্

(কিতাবুর রূহ্- এর বর্ণনা)
প্রশ্নঃ রূহ্ নশ্বর- নাকি অবিনশ্বর? ইহা কি ক্ষনস্থায়ী- না চিরস্থায়ী?
জওয়াবঃ রূহ্ আল্লাহর সৃষ্টি-   সুতরাং  নশ্বর। আম্বিয়ায়ে কেরাম       থেকে    শুরু    করে    সাহাবা,     তাবেয়ী    সবাই একবাক্যে            বলেছেন-           অন্যান্য            সৃষ্টি           যেমন পরিবর্তনশীল- তদ্রƒপ রূহ্ও পরিবর্তনশীল।

অবশ্য কেউ কেউ  রূহ্কে অবনিশ্বর ও    চিরস্থায়ী  বলে   মন্তব্য   করেছেন।   তাঁদের   যুক্তি-    রূহ্   হলো    আল্লাহর নির্দেশ।   সুতরাং   আল্লাহর    নির্দেশ     সৃষ্টি    নয়-    যেমন আল্লাহর কালাম সৃষ্টি নয়।

অন্য একদল  বলেছেন-  রূহ্ সৃষ্টিও নয়-  আবার স্রষ্টাও নয়।   জাহাম    ইব্নে   সাফওয়ান    এবং    তার   অনুসারী একদল   লোকের   ধারণা-   রূহ্   মাখলুক   নয়-   সুতরাং  চিরস্থায়ী।    তাদের    এই     মতবাদ    বাতিল।     সে    ছিল  মো’তাযেলা ফের্কার লোক।
বিভিন্ন মতামতঃ

১।     আহ্লে     সুন্নাত      ওয়াল      জামাআত     এবং     হাদীস বিশারদদের    মতে   সমস্ত   রূহ্  আল্লাহর   সৃষ্টি।  তাদের দলীল   হলো-   নবী   করিম      সাল্লাল্লাহু    আলাইহি   ওয়া  সাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীস-
قال رسول اللّٰہ ﷺ الارواح جنود مجندۃ
অর্থঃ  ‘‘রূহ্সমূহ  হচ্ছে  আল্লাহর  সুসজ্জিত  সৈন্যবাহিনী  স্বরূপ’’। অতএব রূহ্ হলো আল্লাহর সৃষ্টি।

২।     অন্য     একদল     বলেছেন-     রূহ্     হচ্ছে     আল্লাহর  আদেশ।     ইহার   প্রকৃত   স্বরূপ     আল্লাহ্পাক   উদঘাটন করেননি।    তাঁদের     দলীল    হলো-    আল্লাহর        কালাম মজিদের  সুরা  বণী  ইসরাইল  -এর     ৮৫  আয়াত-   قُلِ   الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي
“বলুন! রূহ্ হচ্ছে আমার প্রভূর আদেশ”।

৩।     আরেকদল     উলামা     বলেছেন-     রূহ্সমূহ     হচ্ছে  আল্লাহর নূর এবং হায়াত সমূহের মধ্যে একটি হায়াত। তাঁদের     দলীল     হলো-     নবী     করিম     (দঃ)     এরশাদ  করেছেন-
ان  اللّٰہ  خلق  خلقہ  فی  ظلمۃ  والقی  علیھم  من  نورہ  ۔  رواہ احمد فی مسندہ والترمذی فی الایمان
অর্থাৎ     “আল্লাহ্     তায়ালা    তাঁর    সৃষ্টজীবকে    অন্ধকার অবস্থায়     সৃষ্টি     করে     তার    মধ্যে     তাঁর    নূর     নিক্ষেপ করেছেন’’।   (মুসনাদে   আহমদ   ২য়   খন্ড     ১৭৬    পৃঃ, তিরমিযি কিতাবুল ঈমান ১৮ পৃষ্ঠা)।


প্রচার কর, যদি একটি মাত্র আয়াত ও হয় সহীহ বুখারী -৩৪৬১